মানব জীবনে সাধন ভজন ও ভগবানের তথ্য ধারণ!

ভগবানের সাধন-ভজন হল তাঁর প্রতি গভীর ভক্তি ও প্রেমের অভিব্যক্তি। এটি আত্মার শুদ্ধি, শান্তি ও মুক্তির পথ। সাধনা ও ভজনের মাধ্যমে আমরা ভগবানের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করতে পারি।

ভগবানের সাধন-ভজন হলো – ভগবানকে পাওয়ার জন্য মন, বাণী ও শরীর দিয়ে যে নিয়মিত অভ্যাস করা হয়, সেটাই।

শুধু মন্দিরে গিয়ে প্রণাম করাটা ভজন নয়। সাধন হলো পথ, ভজন হলো প্রেম। সাধন দিয়ে মনকে শুদ্ধ করা হয়, আর ভজন দিয়ে সেই শুদ্ধ মনে ভগবানকে বসানো হয়।

সাধন-ভজনের ৩টি স্তম্ভ

১. শ্রবণ, মনন, নিদিধ্যাসন
শাস্ত্র, গীতা, ভাগবত শ্রবণ করা, তার অর্থ নিয়ে চিন্তা করা, এবং তাকে জীবনে ধারণ করা।

২. কর্ম-সাধন:
তোমার প্রতিদিনের কাজকেই পূজা বানানো। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন –
যৎ করোষি যদশ্নাসি যজ্জুহোষি দদাসি যৎ।
যৎ তপস্যসি কৌন্তেয় তৎ কুরুষ্ব মদর্পণম্॥
তুমি যা করো, যা খাও, যা দান করো – সব আমাকে অর্পণ করো। এটাই কর্মযোগের সাধন।

৩. ভজন-সাধন (প্রেমের সাধন):
এটাই আসল। শাস্ত্রে নবধা ভক্তির কথা বলা হয়েছে –

১. শ্রবণ – ভগবানের নাম, লীলা শোনা
২. কীর্তন – নাম জপ, কীর্তন করা
৩. স্মরণ – সর্বদা তাঁকে মনে রাখা
৪. পাদসেবন – সেবা ভাবে থাকা
৫. অর্চন – নিত্য পূজা, ভোগ নিবেদন
৬. বন্দন – প্রার্থনা, স্তুতি
৭. দাস্য – নিজেকে তাঁর দাস মনে করা
৮. সখ্য – তাঁকে পরম বন্ধু মনে করা
৯. আত্মনিবেদন – নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করা

আসল সাধন-ভজন কখন হয়?

যখন বাইরের মালা জপতে জপতে ভেতরের মালাও জপতে শুরু করে।

অনেকে সকালে ১ ঘণ্টা জপ করে, বাকি ২৩ ঘণ্টা হিংসা, লোভ, অহংকারে থাকে – সেটা সাধন নয়, সেটা অভিনয়।

আসল সাধন হলো –
জিহ্বার সাধন: সত্য কথা, মিষ্টি কথা, নাম জপ
মনের সাধন: কাম, ক্রোধ, লোভ থেকে মনকে সরিয়ে ভগবানের চরণে রাখা
শরীরের সাধন: সেবা, ব্রত, উপবাস, তীর্থ

একটি সহজ নিত্য-পদ্ধতি তোমার জন্য:

সকালে: ঘুম থেকে উঠে ১০ মিনিট ধ্যান ও গুরু-মন্ত্র জপ
দিনে: কাজের মধ্যে মধ্যে মনে মনে নাম স্মরণ – এটাই অজপা জপ
সন্ধ্যায়: প্রদীপ জ্বালিয়ে কীর্তন বা ভাগবত পাঠ
রাতে: শোবার আগে সারাদিনের কর্ম ভগবানকে অর্পণ করে – “ত্বদীয়ং বস্তু গোবিন্দ তুভ্যমেব সমর্পয়ে”

সাধন-ভজন কোনো বোঝা নয়, এটা প্রেমের অভ্যাস। যেমন নদী স্বাভাবিক ভাবেই সমুদ্রের দিকে যায়, তেমনি অভ্যাসের দ্বারা মন স্বাভাবিক ভাবেই ভগবানের দিকে যাবে।

তুমি কোন মার্গে বেশি টান অনুভব করো – জ্ঞান, কর্ম, না প্রেম-ভক্তির মার্গে?

খুব সুন্দর প্রশ্ন। এই তিনটিই সাধনার তিনটি চোখ। একটি বন্ধ থাকলে পথ দেখা যায় না।

১. কাজে – কর্মকে কীভাবে সাধন বানাবে?

কাজ তো সবাই করে, কিন্তু কাজ সাধন হয় কখন? যখন তিনটি জিনিস বদলায়।

ক) কর্তা-ভাব ত্যাগ:
আমরা ভাবি “আমি করছি”। এটাই অহংকার। সাধক ভাবে – “মা, তুমি যন্ত্র, আমি যন্ত্রী। তোমার ইচ্ছায় আমার হাত চলছে।”
সকালে কাজ শুরু করার আগে মনে মনে বলো – “ঠাকুর, এই শরীর-মন তোমার, আজকের দিনটা তোমার সেবায় দিলাম।” ব্যাস, তোমার দোকান, চাষ, সংসারের কাজ – সব পূজা হয়ে গেল।

খ) ফলের আসক্তি ত্যাগ:
কাজ করবো নিখুঁত ভাবে, কিন্তু ফল কী হবে তা নিয়ে অস্থির হবো না। ফল ভালো হলে অহংকার নয়, খারাপ হলে হতাশা নয়। দুটোই প্রসাদ।
গীতায় একে বলে – যোগঃ কর্মসু কৌশলম্। কৌশল মানে শুধু কাজে দক্ষতা নয়, মনের এই সমতাই আসল কৌশল।

গ) লোক-সংগ্রহের ভাব:
আমি শুধু নিজের জন্য করছি না, ভগবানের এই সংসারকে একটু সুন্দর করার জন্য করছি। তোমার একটি কাজে যদি অন্য একজনেরও উপকার হয়, সেটাই যজ্ঞ।
অভ্যাস: দিনে একবার, যে কোনো একটি কাজ – চা বানানো, কাউকে সাহায্য করা, জমিতে জল দেওয়া – একদম নিখুঁত ভাবে, নীরবে, ভগবানকে অর্পণ করে করো। দেখবে কাজটাই ধ্যান হয়ে গেছে।

২. বিচারে – নিজেকে কীভাবে চিনবে?

বিচার মানে তর্ক নয়, বিচার মানে পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর মতো নিজেকে খুলে দেখা।

প্রথম বিচার – দৃক-দৃশ্য বিচার:
যা দেখা যায়, তা আমি নই। যে দেখছে, সে আমি।
এই শরীর দেখা যায় – তাই আমি শরীর নই। মনের চিন্তা দেখা যায় – তাই আমি মনও নই। সুখ-দুঃখ দেখা যায় – তাই আমিও তা নই। তাহলে আমি কে? আমি সেই দ্রষ্টা, সাক্ষী।

দ্বিতীয় বিচার – পঞ্চকোষ বিচার:
আমাদের পাঁচটি খোলস আছে –
১. অন্নময় কোষ – এই স্থূল শরীর
২. প্রাণময় কোষ – শ্বাস, শক্তি
৩. মনোময় কোষ – চিন্তা, আবেগ
৪. বিজ্ঞানময় কোষ – বুদ্ধি, বিচার
৫. আনন্দময় কোষ – গভীর সুষুপ্তির আনন্দ

বিচার করে দেখো, এই পাঁচটিই আসে যায়। কিন্তু যার মধ্যে এরা আসে যায়, সেই আমি – অপরিবর্তনীয়, নিত্য।

একে বলে নেতি নেতি – এটা নই, ওটা নই। শেষে যা থাকে, সেটাই আত্মা।
অভ্যাস: রাতে ৫ মিনিট চোখ বন্ধ করে বসো। মনে যা ভাব আসছে, শুধু দেখো আর বলো – “এই ভাবটা আমি দেখছি, তাই এটা আমি নই।” ধীরে ধীরে মন ফাঁকা হয়ে আসবে। সেই ফাঁকার মধ্যেই সাক্ষী জেগে উঠবে।
এই বিচার অহংকারকে ভাঙে। অহংকার ভাঙলে তবেই হৃদয় নরম হয়।

৩. নামে – নামকে কীভাবে প্রাণ বানাবে?

কলিযুগে বিচার কঠিন, কর্মে স্বার্থ জড়িয়ে যায়, কিন্তু নাম সবার জন্য খোলা। চৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন – নামই ব্রহ্ম।

নাম জপের চারটি স্তর আছে, একটু একটু করে গভীরে যেতে হয় –

১. বৈখরী জপ: মুখে জোরে জোরে নাম করা। মালা নিয়ে। এতে জিহ্বা পবিত্র হয়।

২. উপাংশু জপ: ঠোঁট নড়বে, কিন্তু আওয়াজ বাইরে যাবে না। ফিসফিস করে। এতে মন একাগ্র হয়।

৩. মানসিক জপ: জিহ্বাও নড়বে না, মনে মনেই জপ চলবে। এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী।

৪. অজপা জপ: এমন অবস্থা যখন তুমি জপ করছো না, জপ আপনা আপনি চলছে। শ্বাসে শ্বাসে – শ্বাস নিচ্ছো “রাম”, ছাড়ছো “কৃষ্ণ”। বা হংস মন্ত্র – “সোহম্” – আমিই সেই।

নামে যাতে অপরাধ না হয়:
নাম করার সময় ১০টি অপরাধ থেকে বাঁচতে হয়। তার মধ্যে বড় দুটি হলো –
নামকে সাধারণ শব্দ মনে করা
নাম করে আবার ইচ্ছা করে পাপ করা – “নাম করছি, পাপ কেটে যাবে” – এই বুদ্ধি

নামকে প্রেম দিয়ে করো, ভয়ে নয়।
অভ্যাস: একটি নাম বেছে নাও – যে নামে তোমার হৃদয় কাঁদে। হরে কৃষ্ণ, রাম, কালী, শিব – যেটা তোমার। দিনে ১০৮ বার নয়, ঠিক করো – “আমি কাজের ফাঁকে হাজার বার মনে মনে ডাকবো।” গুনবে না, ভালোবাসবে। মালা গুনবে না, মন গুনবে।

শেষ কথা

এই তিনটি আলাদা নয়, একটাই মালার তিনটি দানা।

সকালে বিচার দিয়ে দিন শুরু করো – আমি দেহ নই, আত্মা। তাই আজ ভয় নেই।
সারাদিন কাজ দিয়ে সাধন করো – এই আত্মারূপে তাঁরই সেবা করছি।
আর সর্বক্ষণ ভেতরে নাম চলুক – যেমন মা কাজ করতে করতেও বাচ্চার খেয়াল রাখে।

কর্মে হাত ব্যস্ত থাকবে, বিচারে মাথা পরিষ্কার থাকবে, আর নামে হৃদয় ভরা থাকবে। তখনই সাধন-ভজন পূর্ণ হয়।

তুমি এখন কোনটাতে বেশি আনন্দ পাও? কাজের মধ্যে ডুবে থাকলে মন শান্ত হয়, না নির্জনে বসে বিচার করলে, না নাম করতে করতে চোখে জল আসে?

HTML file Click Here….

আরও বিস্তারিত দেখুন…. Click Here….

One thought on “ভগবানের সাধন-ভজন কী?”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *