সাধন-ভজন কী?
ভগবানকে পাওয়ার জন্য মন, বাণী ও শরীর দিয়ে যে নিয়মিত অভ্যাস করা হয়, সেটাই সাধন-ভজন। সাধন হলো পথ, ভজন হলো প্রেম। সাধন দিয়ে মনকে শুদ্ধ করা হয়, আর ভজন দিয়ে সেই শুদ্ধ মনে ভগবানকে বসানো হয়।
যৎ করোষি যদশ্নাসি যজ্জুহোষি দদাসি যৎ।
যৎ তপস্যসি কৌন্তেয় তৎ কুরুষ্ব মদর্পণম্॥ — গীতা ৯/২৭
তুমি যা করো, যা খাও, যা দান করো — সব আমাকে অর্পণ করো।
মার্গ ১ • কর্মযোগ
১. কর্ম-মার্গ — কাজে সাধন
মূল কথা: ফলের আশা ছেড়ে কর্ম করো।
কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন। — গীতা ২/৪৭
কীভাবে কর্ম সাধন হয়?
কর্তা-ভাব ত্যাগ: "আমি করছি" নয়, "তিনি করাচ্ছেন"। সকালে বলো — এই শরীর তোমার সেবায় দিলাম।
ফলের আসক্তি ত্যাগ: কাজ নিখুঁত করবো, কিন্তু ফল নিয়ে অস্থির হবো না। লাভ-লোকসান দুটোই প্রসাদ।
লোক-সংগ্রহ: নিজের জন্য নয়, এই সংসারকে সুন্দর করার জন্য কাজ।
অভ্যাস: দিনে একটি কাজ — চা বানানো, কাউকে সাহায্য করা, জমিতে জল দেওয়া — একদম নীরবে, ভগবানকে অর্পণ করে করো। কাজটাই ধ্যান হয়ে যাবে।
মার্গ ২ • জ্ঞানযোগ
২. জ্ঞান-মার্গ — বিচারে সাধন
মূল কথা: আমি কে? — এই প্রশ্নের উত্তর।
সাধন-চতুষ্টয়
- বিবেক: নিত্য-অনিত্য বিচার। শরীর অনিত্য, আত্মা নিত্য।
- বৈরাগ্য: অনিত্য বস্তুর প্রতি আসক্তি ত্যাগ।
- ষট্-সম্পত্তি: শম (মন সংযম), দম (ইন্দ্রিয় সংযম), উপরতি, তিতিক্ষা, শ্রদ্ধা, সমাধান।
- মুমুক্ষুত্ব: মুক্তির জন্য তীব্র আকুতি।
দুটি প্রধান বিচার
দৃক-দৃশ্য বিচার: যা দেখা যায়, তা আমি নই। যে দেখছে, সে আমি। শরীর, মন, সুখ-দুঃখ — সব দৃশ্য। আমি দ্রষ্টা, সাক্ষী।
পঞ্চকোষ বিচার: অন্নময়, প্রাণময়, মনোময়, বিজ্ঞানময়, আনন্দময় — এই পাঁচটি খোলস আসে যায়। এর ভেতরে যে অপরিবর্তনীয় ‘আমি’ আছে, সেটাই আত্মা। একে বলে নেতি নেতি — এটা নই, ওটা নই।
অভ্যাস: রাতে ৫ মিনিট চোখ বন্ধ করে বসো। মনে যা ভাব আসছে, শুধু দেখো আর বলো — "এই ভাবটা আমি দেখছি, তাই এটা আমি নই।" সেই ফাঁকার মধ্যেই সাক্ষী জেগে উঠবে।
মার্গ ৩ • ভক্তিযোগ
৩. ভক্তি-মার্গ — নামে সাধন
মূল কথা: জ্ঞান দিয়ে জানা যায়, কর্ম দিয়ে শুদ্ধ হওয়া যায়, কিন্তু পাওয়া যায় শুধু প্রেম দিয়ে।
ভক্ত্যা মামভিজানাতি যাবান্ যশ্চাস্মি তত্ত্বতঃ। — গীতা ১৮/৫৫
কলিযুগে নামরূপে কৃষ্ণ অবতার। নাম হইতে হয় সর্ব জগৎ নিস্তার। — চৈতন্য চরিতামৃত
নবধা ভক্তি
শ্রবণ, কীর্তন, স্মরণ, পাদসেবন, অর্চন, বন্দন, দাস্য, সখ্য, আত্মনিবেদন
নাম জপের চার স্তর
১. বৈখরী: মুখে জোরে জোরে। জিহ্বা পবিত্র হয়।
২. উপাংশু: ঠোঁট নড়বে, আওয়াজ নয়। মন একাগ্র হয়।
৩. মানসিক: মনে মনেই জপ। সবচেয়ে শক্তিশালী।
৪. অজপা: তুমি করছো না, আপনা আপনি চলছে। শ্বাসে শ্বাসে — সোহম্।
অভ্যাস: একটি নাম বেছে নাও — হরে কৃষ্ণ, রাম, কালী, শিব — যে নামে হৃদয় কাঁদে। গুনবে না, ভালোবাসবে। কাজের ফাঁকে মনে মনে হাজার বার ডাকো। মালা গুনবে না, মন গুনবে।
তিনের মিলন — পূর্ণ সাধন
সকালে বিচার দিয়ে দিন শুরু করো — আমি দেহ নই, আত্মা। তাই আজ ভয় নেই।
সারাদিন কাজ দিয়ে সাধন করো — এই আত্মারূপে তাঁরই সেবা করছি।
সর্বক্ষণ ভেতরে নাম চলুক — যেমন মা কাজ করতে করতেও বাচ্চার খেয়াল রাখে।
কর্মে হাত ব্যস্ত থাকবে, বিচারে মাথা পরিষ্কার থাকবে, আর নামে হৃদয় ভরা থাকবে। কর্ম ছাড়া ভক্তি ভাবুকতা, ভক্তি ছাড়া জ্ঞান শুষ্ক পাণ্ডিত্য, আর জ্ঞান ছাড়া কর্ম অন্ধ পরিশ্রম।
যত মত তত পথ — শ্রী রামকৃষ্ণ